বিদ্যালয়ের ইতিহাস
গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন-“হে ভিক্ষসংঘ! তোমরা বহুজনের হিত ও সুখের জন্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়।” এই যে এঁতিহাসিক বাণী এটিকে ধারণ করে কালে কালে যুগে যুগে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মানুষের কল্যাণে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। সারা বিশ্বে আজও সে ধারা প্রবাহমান । মানবীয় হিত ও সুখের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বন্ত্র ও আশ্রয় অন্তর্ক্ত। সেই আদর্শে বলীয়ান হয়ে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘ মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন। উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশের প্রায় সকল বৌদ্ধ বিহার ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় । তেমনি একটি হলো রাজধানী ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার। সেই দুঃসহ দিনে এ বিহারের অধিপতি মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের এগিয়ে এলেন মানুষের জীবন রক্ষার ভূমিকায়। সাথে ছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্য সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের। তাঁরা বিহারে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নরনারীকে আশ্রয় দিয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন ভারত-প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের ।
অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে যুদ্ধাহত ও শহীদ এবং বিধ্বস্ত পরিবারের ছেলেদের আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন ধর্মরাজিক অনাথালয় ৷ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য এ অনাথালয় । অনাথালয়ে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো, অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা হলো । বাকী রইলো শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা পিতৃ-মাতৃহীন, দুঃস্থ সহায়হীন ছেলেদের ভবিষ্যত চিন্তা করে সেদিন মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা শিষ্য সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরকে জানালেন। শিষ্যও গুরুর প্রস্তাবে অতীব আনন্দিত হন। কারণ এটা ছিল তাঁরও চিন্তা এবং একটি সময়োচিত উদ্যোগ । তাঁদের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানালেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের নেতৃবৃন্দ। তারা বিপুলভাবে উৎসাহিত করলেন।
বলাবাহুল্য, ১৯৭২ সালের ঢাকা আর বর্তমানের ঢাকা এক নয়। তাছাড়া বিভিন্ন শহর এবং অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল প্রায় বিচ্ছি্ন। এরকম অবস্থায় প্রথমে অনাথালয়, পরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। তারপর প্রতিষ্ঠিত হয় চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক । আজ এগুলি রূপকথার মতো মনে হলেও এটি বাস্তবতা । তখন উন্নত ফটোগ্রাফী ছিল না, ভিডিও ছিলনা । তাই ছবির মাধ্যমে অতীতকে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এই অনাথালয়ে এক সময় মুসলমান সম্প্রদায়েরও ছেলে ছিল। পরে সরকার তাদের মুসলিম এতিম খানায় নিয়ে যায়। কারণ তাদের নিজন্ব কিছু ধর্মকর্ম ও আচার অনুষ্ঠান পালন করা সহজ হয়। সেদিন কর্তৃপক্ষও সরকারের সাথে সহযোগিতা করেছিলেন।
১৯৭২ সালে যে অভিযাত্রা শুরু হয় তা সিঁড়ির পর সিঁড়ি বেয়ে বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। তারপরের ইতিহাস যতটুকু সম্ভব সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন লেখায় কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। সেদিন অসাম্প্রদায়িক আদর্শে যে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আজও সে আদর্শ বিরাজমান। সদাশয় সরকারের প্রবিধিমালার বিশেষ ধারায় গঠিত ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়ে আসছে। এটি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির একটি লালন ক্ষেত্র, সাম্য মৈত্রীর মিলন তীর্থ ।